
ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যেখানে মানুষের যেকোনো পরিস্থিতিকেই বিবেচনায় নিয়ে সহজতার পথ রাখা হয়েছে। নামাজ (salat) মুসলিম জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আর নামাজ শুদ্ধভাবে আদায়ের জন্য ওযু (wudu) বা গোসল অপরিহার্য। তবে কিছু পরিস্থিতিতে পানি ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে গেলে ইসলাম বিকল্প পথ হিসেবে দিয়েছে tayammum—একটি সহজ, পবিত্রতা অর্জনের বিশেষ পদ্ধতি। এই প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে দেখব tayammum কী, এর ইতিহাস, কোন অবস্থায় এটি বৈধ, কোন উপাদান দিয়ে করা হয় এবং সহিহ হাদিস অনুযায়ী এর ধাপসমূহ।
আরবি শব্দ tayammum এর অর্থ হলো “উদ্দেশ্য করা” বা “মুখ করা”—অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে মাটির দিকে মনোযোগ দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা। শরিয়তের পরিভাষায়, পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হলে পরিষ্কার মাটি বা মৃত্তিকা জাতীয় কিছু ব্যবহার করে যে বিকল্প পবিত্রতা অর্জন করা হয়, তাকে তায়াম্মুম বলা হয়।
📌 কুরআন:
“...আর পানি না পেলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।” — সুরা মা’ইদাহ ৫:৬
📌 হাদিস: রাসূল ﷺ বলেন:
“পুরো পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র এবং মসজিদ করা হয়েছে।” — সহিহ বুখারি (৩৩৫)
তায়াম্মুমের বিধান নাযিল হয় একটি বিশেষ ঘটনার পর। আয়েশা (রাঃ) এর হারানো হার খুঁজতে গিয়ে পুরো কাফেলা থেমে যায় এবং আশেপাশে পানি না থাকায় সাহাবিরা বিপাকে পড়েন। তখন কুরআনের আয়াত নাযিল হয় যেখানে তায়াম্মুমের অনুমতি দেওয়া হয়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইসলাম কষ্টকে সরিয়ে সহজতার পথ বেছে নেয়—যা একে বৈশ্বিক ও মানবিক ধর্ম হিসেবে আলাদা করে।
— সহিহ বুখারি (৩৩৪)
এখানেই ভুল সবচেয়ে বেশি হয়। অনেকেই মনে করেন সামান্য অসুবিধা হলেই তায়াম্মুম করা যায়, যা সঠিক নয়। শরিয়ত তায়াম্মুমকে অনুমতি দিয়েছে কেবল যখন পানি ব্যবহার করা সম্ভব নয় বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। চলুন যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্লেষণ করা যাক—
এটি সবচেয়ে সরল এবং প্রধান কারণ। যদি পানি অনুসন্ধানের পরও না পাওয়া যায়, তাহলে তায়াম্মুম বৈধ।
রেফারেন্স: সুরা মা’ইদাহ ৫:৬
যেমন—
রেফারেন্স: রাসূল ﷺ আহত এক সাহাবির পানির বদলে তায়াম্মুম করতে বলেছিলেন। — সুনান আবু দাউদ (৩৩৬)
যেমন—
যদি পানি পাওয়ার চেষ্টা করলে নামাজের সময় বের হয়ে যায়, তবে তায়াম্মুম বৈধ। ইসলামের মূলনীতি—নামাজের সময় নষ্ট নয়।
যেমন—
ইসলাম সর্বদা নিজের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।
অনেক ভুল শিক্ষায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়—তাই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
ইসলামের ফিকহ অনুযায়ী, tayammum এর জন্য মূল শর্ত হলো: পবিত্র মাটির উপাদান হতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক ধুলা থাকে।
সাহাবিরা পাথর, বালি, ধুলা—বহু উপাদান দিয়ে তায়াম্মুম করেছেন। (রেফারেন্স: ইবনু তাইমিয়্যাহ, মজমু’ ফাতাওয়া)
এখন আসল অংশ—প্রক্রিয়াটি কীভাবে করতে হয়। সঠিক পদ্ধতি জানলে ভুলের সুযোগ থাকে না।
“পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ পড়ব”—মনে মনে এই নিয়ত করা।
মাটি, বালি বা ধুলার উপর হাত রাখা। হালকা ধুলা লাগলেই যথেষ্ট।
হাতে থাকা ধুলা দিয়ে সম্পূর্ণ মুখে মাসাহ করবেন।
এবার কনুই পর্যন্ত হাত মাসাহ করতে হবে। কোনো অংশ বাদ দেওয়া যাবে না।
রাসূল ﷺ বলেন: “তোমাদের জন্য যথেষ্ট হলো এইভাবে—একবার হাত মাটিতে রেখে মুখ ও হাত মুছা।” — সহিহ মুসলিম (৩৬৮)
এই অংশটি অপরিহার্য, কারণ ভুলের কারণে অনেকের তায়াম্মুম শুদ্ধ হয় না।
এটি ভুল—হাত কনুই পর্যন্ত মাসাহ করতে হয়।
ডিজিটাল টেবিল, প্লাস্টিক, কাঁচ—এসব বৈধ নয়।
ইসলাম অলসতাকে অনুমোদন করে না।
এক তায়াম্মুমে এক ফরজ নামাজ—এটাই অধিক গ্রহণযোগ্য মত।
যে কারণে ওযু ভেঙে যায়, একই কারণে তায়াম্মুমও ভেঙে যায়। অর্থাৎ—
এছাড়া, পানি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তায়াম্মুম বাতিল হয়ে যায়।