অপারেশন হটপ্যান্টস - ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১

যেদিন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতীয়রা বিমান হামলা করে ডুবিয়ে দেয় বাংলাদেশি যুদ্ধ জাহাজ পদ্মা ও পলাশ।
আফজাল মিয়া তার টীমমেট দের দিয়ে গানবোট করে খুব সহজেই এসে পৌছেছেন রুপসা নদীতে, খুলনা শিপইয়ার্ড এর কাছাকাছি। তাদের গানবোট এর সাথে এসেছে আরো দুটি জাহাজ। তিনটি জলযানে মধ্যে দুটি মুক্তিবাহিনীর আর একটি মিত্রবাহিনীর। মুক্তিবাহিনীর জাহাজ গুলোর নাম 'পদ্মা' ও'পলাশ' আর ভারতীয়টার নাম 'INS প্যানভেল'। অপারেশনের লক্ষ ছিল খুলনার পাক নৌঘাটি দখল করা। 

কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই জাহাজ গুলো টার্গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। বহরের সামনে মিত্রবাহিনীর জাহাজ  INS প্যানভেল আর তাকে অনুসরন করে পদ্মা ও পলাশ পিছনে আসছিলো। আফজাল মিয়া ছিলেন পদ্মা জাহাজের আর্টিফিশার। আর বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ছিলেন পলাশ জাহাজের আর্টিফিশার।

আফজাল মিয়া ব্যস্ত হয়ে ছিলেন ইঞ্জিন রুমের টুকি টাকি কাজে। এমন সময় গোটা ইঞ্জিনরুমে আগুন ধরে পড়ল। তিনি ছিটকে পড়লেন। যখন হুশ হলো, তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। ক্ষতবিক্ষত আফজাল মিয়া অনেক কষ্টে ইঞ্জিনরুম হতে বেরিয়ে এলেন। দেখতে পেলেন এক করুন দৃশ্য। নিহত যোদ্ধাদের লাশ পড়ে আছে। আহতরা যে ভাবে পারছেন নদীতে ঝাপিয়ে পড়ছেন - জীবন বাঁচাতে। 

আফজাল মিয়া লাইফ জ্যাকেট পড়ে রক্তাক্ত পা নিয়ে নদী তে ভেসে আছেন। তিনি কিভাবে নদী তে ঝাপ মেরেছেন - তা তার মনে নেই। অনেকক্ষন পর তিনি নিজেকে নদীর তীরে আবিষ্কার করেন। তীরে উঠার পর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা রাজাকারদের হাতে ধরাপরে এবং তাদের হাতে শহীন হন। তাদের ভেতর বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনও ছিলেন।

সময় টা ছিল ১৯৭১ সালের ১০ ই ডিসেম্বর। সেদিন ভারতীয় জংগি বিমান ভুলক্রমে মুক্তিবাহিনীর এই দুই জাহাজে হামলা করে বসে। সেদিন দুপুরে তিনটি জংগি বিমান তাদের জাহাজের উপর দিয়ে দক্ষিন-পশ্চিমে উড়ে যায়। জাহাজের নৌসেনারা বিমান গুলোকে পাক বিমান মনে করে হামলা করতে চাইলে ভারতীয় জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং মিশনের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ অনুমতি দেননি। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, ঘটনার সেখানেই শেষ। কিন্তু বিমান গুলো আবার পিছন দিক থেকে উড়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের জাহাজে আক্রমন করে বসে। কোনো রকম সিগন্যাল না দিয়েই শুরু হয় পদ্মা ও পলাশের উপর বোমাবর্ষণ। প্রথম হামলাতেই পদ্মা ধংস হয়। তারপর সচল পলাশ এর উপর হামলা চালায় ভারতীয় জংগি বিমান। কিন্তু আশ্চার্যজনক ভাবে জংগি বিমান ভারতীয় জাহাজ INS প্যানভেল এর কোনো ক্ষতি করে নি।

ভারতীয় বাহিনীর সেই রহস্যজনক হামলায় বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সহ আরো অনেক নৌ-মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধারা হারায় পদ্মা ও পলাশ জাহাজ দুটো। রুহুল আমিন ছিলেন একমাত্র বীর শ্রেষ্ঠ, যিনি পাক বাহিনী নয়, বরং ভারতীয় বাহিনীর কারনে মারা গিয়েছিলেন।

পরবর্তিতে ভারতীয় বিমান বাহিনী জানায়..." জাহাজ তিনটি খুলনায় পাক নৌঘাটির খুব কাছাকাছি ছিলো বলে ভারতীয় পাইলটরা সেগুলোকে পাকিস্তানী জাহাজ ভেবেছিলো"। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জাহাজ ধ্বংস করা হলেও ভারতীয় জাহাজটি কেনো হামলার স্বীকার হলোনা সে ব্যাপারে তারা কোনো সদুত্বর দিতে পারেনি। এটা কি ভারতীয় বাহিনীর অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিলো? আর ভুল যদি হয়েও থাকে, তাহলে ভারতীয় বিমানগুলো ভারতীয় জাহাজটিকে ঢুবায়নি কেন? কেন বেছে বেছে কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের জাহাজ দুটোকেই ঢুবানো হলো?

পদ্মা ও পলাশ যুদ্ধ জাহাজ
ছবিঃ পদ্মা ও পলাশ যুদ্ধ জাহাজ


সূত্রঃ একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা
© অনির্বাণ