তেলের সাতকাহন



আশা করি আপনাদের বুঝতে সমস্যা হচ্ছে না যে আমি এখানে রান্না করার বা মেয়েদের চুলে ব্যাবহারের তেল নিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি না। এটা আমাদের প্রতিদিন এর সঙ্গী, আমাদের কারও কারও প্রিয়তমা, প্রতিদিনের পথ চলার সাথী, আমাদের মত আম-জনতার বাহন দুই-চাকার মটরসাইকেল এর প্রধান এবং একমাত্র খাবার এর কথা বলছি। এইতো এইবার আপনি ঠিক ধরতে পেরেছেন, পেট্রোল এর কথা বলছি।

প্রথমেই একটা বড় অসঙ্গতি ঠিক করা দরকার বলে আমি মনে করি। আমরা আমাদের চারপাশে যে সব জানবাহন দেখি সেগুলোর মুল যে অংশ, হ্যাঁ মটর ইঞ্জিন, সেটি কোন শ্রেণীভুক্ত তা কি আমরা সবাই জানি? হ্যাঁ অনেকেই হয়ত জানি তার পরও বলছি, এগুলো সবই গ্যাসোলিন ইঞ্জিন “Gasoline Engine”। মুলত যে জালা দিয়ে এই সব মটর ইঞ্জিন পরিচালিত হয় তার পরিচিতি দিয়েই এই ধরনের ইঞ্জিন কে শ্রেনিভুক্ত করা হয়েছে।

পেট্রোলিয়াম পদার্থ একটি খনিজ পদার্থ, এটা আমরা সবাই জানি। তেলের খানি থেকে যে ক্রুড উত্তলন করা হয় তা রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করে অন্যান্য আরো অনেক ধরনের কেমিকেল এবং মটর ইঞ্জিনে ব্যাবহার যোগ্য তেল উৎপাদন করা হয়। পেট্রোল এক ধরনের তরল উদ্বায়ী পদার্থ যা পেট্রলিয়াম থেকে পাওয়া যায়। অন্যভাবে বলা যায়, যে গ্যাস তরল অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে গ্যাসোলিন বা পেট্রোল বলা হয়। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ
http://en.wikipedia.org/wiki/Gasoline

আমার মনে হয় আমরা একটা পরিষ্কার ধারনা পেয়েছি আমাদের মটর ইঞ্জিন এর জ্বালানীর ব্যাপারে। আমরা মটরসাইকেল এ যে তেল ব্যাবহার করি তা আসলে গ্যাসোলিন বা পেট্রোল। অনেকেই হয়ত বলে উঠবেন আরে ভাই পেট্রোল তো আমরা সবাই চিনি এ আর নতুন কি, তবে পেট্রোল এর সাথে যে আরও একটা তেল পাওয়া যায় অকটেন “Octane”  ঐটা কি জিনিষ? জী ভাই আসছি সে প্রসঙ্গেই এখন আলোচনা করব।

প্রথমে আমরা জেনে নেই অকটেন কি?
OCTANE:  Any of several hydrocarbons having eight carbon atoms connected by single bonds. It is commonly added to gasoline to prevent knocking from uneven burning of fuel in internal-combustion engines. Octane is the eighth member of the alkenes series. Chemical formula: C8H18.

বাংলাঃ সহজ ভাবে বললে অকটেন হোল একধরনের সহযোগী উপাদান যা পরিমিত মাত্রায় ব্যাবহার করা হয় মুল পদার্থের কার্যক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করতে।

আমাদের মটর ইঞ্জিন এ যে পদ্ধতিতে জ্বালানীকে ব্যবহার যোগ্য শক্তিতে রুপান্তর করা হয় তাকে বলা হয় "Combustion processes" এবং এই প্রক্রিয়াটি হয় ইঞ্জিন এর ভিতরে তাই এধরনের ইঞ্জিন কে যান্ত্রিক ভাষায় “Internal Combustion Engine” বলা হয়। মটর ইঞ্জিন উৎপাদনকারী কোম্পানি তাদের নিজস্ব ডিজাইন এর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেলটি পরুনঃ
http://www.howstuffworks.com/engine1.html

মটরসাইকেল উৎপাদনকারী কোম্পানি গুলো চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির মটরসাইকেল উৎপাদন করে এর কোনটি কম আভ্যন্তরীণ চাপ সম্পন্ন এবং কোনটি উচ্চ চাপ সম্পন্ন। সাধারন গ্যাসোলিন খুবই দ্যাহ তরল, সামান্ন আগুনের স্ফুলিঙ্গ একে বিস্ফরিত করতে যথেষ্ট। তবে যখন সাধারন গ্যাসোলিন উচ্চ চাপ সম্পন্ন ইঞ্জিন এ দেওয়া হয় তখন উচ্চ চাপ জনিত উত্তাপ এর কারনে অনেক সময় ইঞ্জিন এর সঠিক সময়ের আগেই তা বিস্ফরিত হয়। যা “Engine Knocking, Detonation, Pinging”  ইত্যাদি বিভিন্ন নামে চেনা যায় এবং সবচেয়ে বড় কথা এটা ইঞ্জিন এর জন্য খুব খারাপ ঘটনা। এই সমস্যা যদি কোন ইঞ্জিন এ কয়েক সেকেন্ড ধরে চলে তবে তা ইঞ্জিনকে বড় ধরনের খতিগ্রস্থ করে ফেলে।

এধরনের সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্যই বিজ্ঞানীরা অকটেন নামক পদার্থ আবিস্কার করেছেন, যা গ্যাসোলিন এর সাথে মিশিয়ে ব্যাবহার করলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যায়। অর্থাৎ অক্টেন এমন এক উপাদান যা কিনা গ্যাসোলিন এর উচ্চদাহ্য গুন কে নিয়ন্ত্রণ করে। আরও উল্লেক্ষ্য যে অকটেন নাম্বার যত বেশী হবে গ্যাসোলিনের দাহ্যগুন ততই নিয়ন্ত্রিত হবে। গ্যাসোলিনের মধ্যে অকটেন এর উপস্থিতি নিরধারন করার জন্য এক ধরনের সঙ্কেত ব্যাবহার করা হয় যা “Research Octane Number (RON)” বা “RON” নামে পরিচিত।

আমাদের দেশে উৎপাদিত গ্যাসোলিন দুটি অকটেন মাত্রায় পাওয়া যায় যা প্রচলিত ভাবে পেট্রোল ও অকটেন নামে পরিচিত। মুলত দুটি একি জিনিষ গ্যাসোলিন অথবা পেট্রোল যাই বলেন, শুধু পার্থক্য তাদের মধ্যেকার “RON” নাম্বার। মজার বেপার হল এক সরকারি পরিপত্রে দেখা যায় গ্যাসোলিনকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে আর তা হল রেগুলার এবং প্রিমিয়াম, সেখানে পেট্রোল বা অকটেন বলে আলাদা করা হয়নাই। সেখানে আরও উল্লেখ আছে যে বর্তমানে রেগুলার অর্থাৎ তথাকথিত পেট্রোলের “RON” নাম্বার হল “৮০” এবং প্রিমিয়াম অর্থাৎ অকটেনের “RON” নাম্বার হল “৯৫”। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্যাসোলিন এর সর্বনিম্ন মান হওয়া উচিৎ “৮৬”। তবে আশার কথা হল ২০১৪ এর মধ্যে বাংলাদেশ এর গ্যাসোলিন এর সর্বনিম্ন মান “৯১” তে উন্নিত করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে এই পিডিএফটির পৃষ্ঠা-৬ এর টেবিল-২ দেখুনঃ
http://www.case-moef.gov.bd/file_zone/feedback/Revisions%20of%20Vehicular%20Emission%20Standards%20for%20Bangladesh.pdf

আমাদের দেশে উৎপাদিত এবং আমদানিক্রিত বেশিরভাগ মটরসাইকেল কম আভ্যন্তরীণ চাপবিশিষ্ট ইঞ্জিন এবং সব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মটরসাইকেল ব্যাবহার নিরদেশিকায় গ্যাসোলিন “৮৬” বা তদূর্ধ্ব ব্যাবহার করতে বলে। এখানে উল্লেক্ষ যে কম “RON” নাম্বারের গ্যাসোলিন ব্যাবহারে ইঞ্জিনের ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে পক্ষান্তরে উচ্চ “RON” নাম্বারের গ্যাসোলিন ব্যাবহারে কোন ক্ষতি নেই বরং সামান্য হলেও প্রয়োজনের চেয়ে অর্থের অপচয় হয়।

যেহেতু আমাদের দেশের প্রাপ্ত গ্যাসোলিন এর সর্বনিম্ন মান মটরসাইকেল কোম্পানি কর্তৃক অনুমোদিত সর্বনিম্ন মান থেকেও কম সেহেতু পেট্রোল বা রেগুলার গ্যাসোলিন ব্যাবহার থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এছাড়াও বিভিন্ন তেলের পাম্পে ভেজাল তেল বিক্রি করে, এসব পাম্প থেকে তেল না নিয়ে অন্ন যে কোন ভাল পাম্প থেকে সরাসরি “RON-95” বা প্রিমিয়াম বা অকটেন নেওয়াই উত্তম।

অনেকেই এখন বলবেন যে ভাই পুরাটা অকটেন ব্যাবহার করলে তো ইঞ্জিন বেশী গরম হয়ে যায় না? আসলে এটাও একটি ভুল ধারনা। গ্যাসোলিন জ্বালানীর তাপ সব সময় একই থাকে কারন তাদের কেমিকেল প্রপার্টি সব সময় একই থাকে যদিও তাদের “RON” নাম্বার আলাদা হয়। “RON” নাম্বার বা অকটেন গ্রেড শুধু আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে সে কতটা চাপ বা অট-ইগ্নিশন প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেলটি পরুনঃ http://engineering.mit.edu/ask/what%E2%80%99s-difference-between-premium-grade-and-regular-gasoline

এখানে আরও উল্লেক্ষ্য যে আমরা অনেকেই তেল খরচ কমানোর জন্য মটর সাইকেল এর কারবোরেটর এর সেটিং পরিবর্তন করি, যা কিনা মোটেও ঠিক না। একবার চিন্তা করে দেখুন একটা ঘোড়াকে যদি তার প্রয়জন মত রোজ খাবার না দেন তো কি সে ভাল দৌড়াতে পারবে? কখনই পারবে না। ঠিক একই ঘটনা ঘটবে ইঞ্জিন এর ক্ষেত্রেও বরং আরও খারাপ খবর হল গ্যাসোলিন গ্যাসীয় অবস্থায় ইঞ্জিন সিলিন্ডার কে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে তাই যখন আপনি তেল কম খরচ এর কথা চিন্তা করে কারবোরেটর থেকে তেল কমিয়ে দেবেন তখন থেকে আপনার ইঞ্জিন প্রয়োজনের থেকে কম তেল  পাবে ফলশ্রুতিতে আপনার ইঞ্জিন বেশী গরম হবে।

আশা করি এখন সবার তেল নিয়ে যত ভুল ধারনা ছিল সব দূর হয়ে যাবে। পরিশেষে সবার কাছে অনুরোধ আপনারা অন্তত যতদিন পর্যন্ত না আমাদের দেশের রেগুলার গ্যাসোলিন এর অকটেন মান প্রস্তাবিত “৯১” না হচ্ছে ততদিন প্রিমিয়াম বা তথাকথিত অকটেন ব্যাবহার করবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

পুনশ্চঃ বাংলায় লেখার চর্চা একেবারেই নেই, ভুলত্রুটি নিজ গুনে ক্ষমা করবেন।

লেখকঃ BDMotorcyclist
তারিখঃ নভেম্বর ২০১৩