ব্যাটেলশিপ কি? ফ্রীগেট-ডেস্ট্রয়ারের সাথে এর পার্থক্য কি?

ব্যাটেলশিপ হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের যুদ্ধ জাহাজ। ১৮৭৮ সালে ফ্রেঞ্চ নেভী "আয়রনক্ল্যাড রিডৌটেবল" নামের একটি যুদ্ধজাহাজ কমিশন্ড করেছিলো, আর সেটিই ছিলো বিশ্বে ব্যাটেলশিপ শ্রেনীর প্রথম যুদ্ধজাহাজ। তাই বলা যায় ব্যাটেলশিপের প্রচলন শুরু হয়েছিলো ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধ সহ বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধে এই জাহাজগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছে।

ব্যাটেলশিপ


ব্যাটেলশিপ নিয়ে সাধারন মানুষের ভেতর প্রচলিত ২টি ভুল ধারনা রয়েছে। সেগুলো হলো....

১. ব্যাটেলশিপগুলো খুবই বিশাল আকারের জাহাজ।
২. ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্যাটেলশিপের পরিবর্তে ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ারের মত আধুনিক যুদ্ধজাহাজের উদ্ভব হয়েছে।

▶ প্রথমে ১ম ভুলটা নিয়ে কথা বলি.... ব্যাটেলশিপ হতে হলেই যে খুব বড় আকারের হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ব্যাটেলশিপের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আর এই বৈশিষ্ট্য গুলো যদি একটি কর্ভেট সাইজের যুদ্ধ জাহাজেও থাকে, তাহলে সেটিকেও ব্যাটেলশিপ বলা যাবে। প্রথম দিকে নির্মিত ব্যাটেলশিপ গুলো ছোট আকৃতির ছিলো, মুলত ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃহদাকার ব্যাটেলশিপ তৈরি শুরু হয়।

ব্যাটেলশিপের প্রধান দুটো বৈশিষ্ট্য হলো পুরু স্টিলের তৈরি বডি এবং বিশালাকার কামান। বর্তমানে প্রচলিত যুদ্ধজাহাজ গুলো সাধারনত ২-৩ ইঞ্চি পুরু স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি করা হয়, আর বিশালাকার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে থাকে ৫-৬ ইঞ্চি স্টিলের পাত। কিন্তু জেনে আশ্চর্য হবেন যে তৎকালীন যুগের ব্যাটেলশিপগুলোর স্টিলের পাত ১২ ইঞ্চি (এক ফুট) থেকে শুরু করে ১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হতো! এত অত্যধিক পুরুত্বের কারনে ব্যাটেলশিপগুলো হতো ভয়াবহ মজবুত এবং ভারী।

ক্যাননের ভেতরের ম্যাকানিজম ও ক্রুজের কার্যক্রম


▶ কেন ব্যাটেলশিপগুলোকে এত মোটা পাত দিয়ে তৈরি করা হতো তার উত্তর লুকিয়ে আছে এর ২য় বৈশিষ্ট্যে। ব্যাটেলশিপের ২য় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রধান অস্ত্র হিসেবে থাকে বিশালাকার কামান। বর্তমানে ফিল্ড আর্টিলারী হিসেবে যেসব কামান ব্যাবহার করা হয় তার গোলার সর্বোচ্চ ব্যাস হয় 155mm, ইঞ্চিতে হিসেব করলে হয় ৬ ইঞ্চি। এছাড়া যুদ্ধ জাহাজে থাকে 40mm ক্যানন ( দের ইঞ্চি)। অথচ ব্যাটেলশিপে যেসব কামান বসানো হতো সেগুলোতে ব্যাবহৃত গোলার ব্যাস হতো ১২ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত ! এই বৃহৎ আকৃতির ভয়ংকর শক্তিশালী গোলা গুলো বহুদুর পর্যন্ত হামলা চালাতে পারতো, সেই সাথে প্রতিপক্ষের জাহাজের অনেক পুরু পাতকেও ভেদ করতে সক্ষম ছিলো। আর অতিতে শত্রুর হামলা থেকে রক্ষা পেতে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা ছিলোনা। তাই তাদের করার মত একটাই কাজ ছিলো, সেটা হলো খুবই শক্তিশালী আর মোটা পাত দিয়ে জাহাজ বানানো।

ব্যাটেলশিপের বিশালাকার ক্যানন


এই দুই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারনে তৎকালিন যুগের সব দেশই নিজ নিজ ব্যাটেলশিপকে অনেক পুরু লোহার পাত দিয়ে তৈরি করতো, যাতে শত্রু ব্যাটেলশিপের গোলার আঘাতে তা ধ্বংস না হয়। আবার প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যাটেলশিপে শক্তিশালী কামান বসাতো, যেন শত্রু জাহাজের পুরু লোহার পাতকে ধ্বংস করা যায়। তাছাড়া ব্যাটেলশিপগুলোকে ভারী করে বানানোর আরেকটা কারন হলো ফায়ারিং এর সময় মোটা ক্যানন গুলোর ব্যাকফায়ার সহ্য করা। ১২ ইঞ্জি ক্যালিবারের কয়েকটি কামানকে যদি আধুনিক ডেস্ট্রয়ারে বসিয়ে দিয়ে ফায়ার করা হয়, তাহলে ব্যাকফায়ারের প্রচন্ড ধাক্কায় ডেস্ট্রয়ার হয়তো উল্টেই যাবে।

▶ এছাড়া ব্যাটেলশিপের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর কিলের অদ্ভুত আকৃতি। (জাহাজে কাঠামোর যে অংশটি জাহাজকে পানিতে ভাসিয়ে রাখে সেটিই হলো কিল)। বর্তমান যুদ্ধজাহাজগুলোতে দেখা যায় যে, কিলের অল্প একটু অংশ পানির নিচে থাকে, বেশিরভাগটাই থাকে উপরে। কিন্তু ব্যাটেলশিপের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্ট। ব্যাটেলশিপ অত্যন্ত ভারী হওয়ায় এর কিলের বেশিরভাগ অংশই ডুবে থাকে।

ডেস্ট্রয়ারের কিল
ব্যাটেলশিপের বিশালাকার কিল


তৎকালীন যুগে কোনো এন্টিশিপ মিসাইল ছিলোনা। তাছাড়া আনগাইডেড টর্পেডো গুলোও আবিষ্কৃত আরো হয়েছে অনেক পরে। তাই ব্যাটেলশিপের প্রধান অস্ত্র ছিলো বিশালাকারের মোটা মোটা কামনা গুলো। এছাড়াও ব্যাটেলশিপে আর্মামেন্ট হিসেবে থাকতো.... বিভিন্ন ক্যালিবারের মেশিনগান, এন্টি এয়ারক্রাফট গান, এন্টি এয়ারক্রাফট ক্যানন, ডেপথ-চার্য। তবে আনগাইডেড টর্পেডো আবিস্কারের পরও ব্যাটেলশিপে কোনো টর্পেডো ব্যাবহৃত হতোনা। কারন টর্পেডোতে যেসব এক্সফ্লোসিভ ব্যাবহৃত হত সেগুলো অতটা শক্তিশালী ছিলো না যে শত্রুর ব্যাটেলশিপকে ডুবাতে পারবে। তাই কার্যত ব্যাটেলশিপের বিরুদ্ধে টর্পেডো তেমন কোনো কাজে আসতো না।

অর্থাৎ কেবল আকারে বড় হলেই যুদ্ধজাহাজকে ব্যাটেলশিপ বলা হতো না, তার জন্য উপরের বৈশিষ্ট্য গুলো থাকতে হতো। আপনারা জার্মান ব্যাটেলশিপ বিসমার্কের নাম নিশ্চই শুনে থাকবেন, সেটি ছিলো বেশ বড় আকারের ব্যাটেলশিপ। কিন্তু অনেকেই যা জানেন না সেটা হলো, বিসমার্ক ছাড়া জার্মানদের অন্যান্য ব্যাটেলশিপের বেশিরভাগই ছিলো ছোটো আকৃতির।

এবার আসছি ২য় ভুলটা নিয়ে। অনেকেই ভাবেন ব্যাটেশিপের যুগ শেষ হবার পর মিসাইল আবিস্কার হওয়ায় ফ্রিগেট ডেস্ট্রয়ারের মত আধুনিক যুদ্ধজাহাজের উদ্ভব ঘটেছে। এই ধারনাটা পুরোপুরি ভুল। কারন ২য় বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার যুদ্ধজাহাজের প্রচলন শুরু হয়েছে এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধে এসব ক্যাটাগরির শত শত জাহাজ যুদ্ধে অংশগ্রহনও করেছে।

এখন প্রশ্ন করবেন এসব জাহাজের ওয়েপন হিসেবে কি ছিলো। এগুলোতে ওয়েপন হিসেবে ছিলো... মেশিনগান, এন্টি এয়ারক্রাফট গান, এন্টি এয়ারক্রাফট ক্যানন, আনগাইডেড টর্পেডো, ডেপথ-চার্য বম্ব, ডেপথ-চার্য রকেট, ASW মর্টার ইত্যাদি। এই জাহাজগুলো ব্যাটেলশিপের সঙ্গি হিসেবে যুদ্ধে অংশ নিতো এবং ব্যাটেলশিপকে স্যাবমেরিনের হাত থেকে রক্ষা করতো। আর এই জাহাজগুলো ভুলেও কখনো একা একা শত্রুর ব্যাটেলশিপের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতর্ন হতোনা। শত্রু ব্যাটেলশিপ দেখলেই এরা লেজ তুলে পালাতো। 

ব্যাটেলশিপ কেন বিলুপ্ত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই এক বাক্যে বলবেন...." আধুনিক এন্টিশিপ মিসাইলবাহী একটা কর্ভেটও মিসাইল মেরে ব্যাটেলশিপ ডুবিয়ে দিতে পারবে, তাই ব্যাটেলশিপ বিলুপ্ত হয়ে গেছে" এই উত্তরটাও ডাহা ভুল। কার্যত বিশ্বে যেসব এন্টিশিপ মিসাইল প্রচলিত হয়ে আসছে সেগুলোর ৯০ ভাগেরও ক্ষমতা নেই একটা ছোট আকারের ব্যাটেলশিপ ডুবানোর। যেমন ধরুন.... বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাতে প্রধান যে এন্টিশিপ মিসাইল রয়েছে ( C-802) তা সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টনি কোনো জাহাজকে ডুবানোর ক্ষমতা রাখে, যেখানে এভারেজ সাইজের একটা ব্যাটেলশিপের ওজন ৫০ হাজার টন। 

অতএব, প্রচলিত এসব এন্টিশিপ মিসাইল ব্যাটেলশিপের কাছে সুইয়ের গুতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ক্যারিয়ার কিলার হেভিওয়েট মিসাইল বা টর্পেডোরও খবর হয়ে যাবে ব্যাটেলশিপ ডুবাতে। 

তাহলে ব্যাটেলশিপ বিলুপ্তির মুল কারন কি?
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধ কৌশলের ব্যাপক পরিবর্তন হতে শুরু করে। গড়পড়তা এলোপাথাড়ি হামলার পরিবর্তে নিখুঁত ভাবে হামলার প্রচলন শুরু হয়। প্রচুক্তির উন্নয়নের ফলে যুদ্ধজাহাজ গুলোতে আধুনিক সেন্সর, টর্পেডো এবং ক্রুজ মিসাইলের প্রচলন শুরু হয়। ব্যাটেলশিপের ক্যানন গুলোকে কেবল শত্রু জাহাজের বিরুদ্ধেই নয়, ভুমিতে বোমা হামলার জন্যও ব্যাবহার করা হতো। তবে ল্যান্ড এট্যাক ক্রুজ মিসাইলের প্রচলন শুরু হওয়ায় দেখা গেলো ক্যাননের চেয়ে গাইডেড মিসাইল অনেক নিখুঁত ভাবে হামলা চালাতে পারে।

তাছাড়া ব্যাটেলশিপ ভয়াবহ রকম ব্যায়বহুল যুদ্ধ জাহাজ। ব্যাটেলশিপ বানাতে ব্যায় হয় প্রচুর পরিমান সময় এবং অর্থ। সেই সাথে বিশালাকার এই জাহাজগুলো পরিচালনা করাও অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। একটা ব্যাটেলশিপ ডুবে যাওয়া মানে বিলিয়ন ডলার নষ্ট হওয়া।

আমেরিকা তাদের মিসৌরি ক্লাসের ব্যাটেলশিপে এন্টিশিপ মিসাইল, আধুনিক সেন্সর ইনস্টল করে আধুনিক যুদ্ধ উপযোগি করে তোলার চেস্টা করেছিলো। কিন্তু সেগুলোকেও ১০ বছর ব্যাবহারের পর ১৯৮০ সালে অবসরে পাঠিয়ে দেয়। সব কিছু মিলিয়ে আধুনিক সমরকৌশলের সাথে ব্যাটেলশিপ আর খাপ খাওয়াতে পারেনি।

লেখকঃ অনির্বাণ