মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এর অজানা সব তথ্য


মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান
স্বাধীন বাংলাদেশের ২য় সেনাপ্রধান

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ভারত ঘেসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশারফ তার নেত্রীত্বে এক সেনা অভ্যুথানের মাধ্যমে তৎকালিন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত এবং গৃহবন্ধি করে, সেই সাথে খালেদ মোশারফ নিজেই সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন।

মাত্র ৪ দিন পরেই ৭ই নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেত্রীত্বে সাধারন সৈনিকদের পাল্টা সেনা অভ্যুথ্যানে সেনাপ্রধান খালেদ মোশারফ নিহত হয় এবং জিয়াউর রহমান বন্ধিদশা হতে মুক্ত হন।

এরপর বেশ কিছুদিন সামরিক শাসন এবং পরবর্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি দেশ পরিচালনায় নিযুক্ত থাকেন। ১৯৮১ সালে একটি সেনা বিদ্রোহের মাধ্যমে মৃত্যুবরনের আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

অন্যান্য আলোচনায় যাব না, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে তার আমলে দূর্বল, দরিদ্র বাংলাদেশের সামরিক উন্নয়নে তার অবদান গুলো আলোচনা করে দেখবো......

➧ সেনাপ্রধান হবার পর থেকেই তিনি অগোছালো সেনাবাহিনীর প্রতিটি সেক্টর, ডিভিশন, ইউনিটকে নতুন করে সাজিয়ে তুলে। মাত্র কয়েক বছর বয়সী তরুন সংগঠন "বাংলাদেশ সেনাবাহিনী"র বিভিন্ন ধরনের অভন্তরিন সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করে।

শেখ মুজিব হত্যা এবং রক্ষি বাহিনী বিলুপ্ত হবার পর সেনাবাহিনীতে বিশ্রিঙ্খলা শুরু হয়। সেনাবাহিনীতে ভারত পন্থি এবং ভারত বিরোধী দলগুলো পাল্টা পাল্টি সেনা অভ্যুধান চালাতে থাকে। কেউ কারো নির্দেশনা মানছে না। কে ঊর্ধ্বতন আর কে অধস্তন সে বিষয়টি কেউ আমলে নিচ্ছে না। এমন পরিস্থিতি জিয়াউর রহমানের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

মেজর মাহবুবুর রহমানের বর্ণনায়, " জিয়াউর রহমান উল্কার মতো বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ছুটে চলেছেন। সেখানে সৈনিকরা কেউ অস্ত্র জমা দেয়না । কেউ ক্যান্টনম্যান্টে আসে না। কেউ কাউকে মানে না। কিন্তু একেকটা জায়গায় গিয়ে তিনি কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন।"

অভ্যুথানে মুক্ত হবার পর সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে ভাষন দেবার সময় তাকে মুক্ত করা সৈনিকরা "জিয়া ভাই, জিয়া ভাই" বলে স্লোগান দিলে তিনি কঠোর স্বরে সবাইকে মিলিটারি রুল অনুজায়ী "স্যার" সম্বোধন করার আদেশ দেন।

➧ সেনাবাহিনীতে রিজার্ভ সৈন্য বাড়ানো এবং কিশোর বয়স থেকেই ছাত্রদেরকে সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে তিনিই চালু করেন "বাংলাদেশ ন্যাশন্যাল ক্যাডেট কোর" বা বিএনসিসি। ছাত্র সমাজে বিএনসিসির প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।

➧ পূর্বে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ ছিলো মাত্র ৪টি। তিনি আরো ৪ টি ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেন। উচ্চশিক্ষিত, দেশপ্রেমিক কমিশন্ড অফিসার তৈরিতে ক্যাডেট কলেজের ভূমিকা কতটা তা সবাই জানেন।

➧ যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্রিঙ্খল বাংলাদেশের অভ্যন্তরিন নিরাপত্তা ব্যাবস্থা শক্তিশালি করতে "মেট্রোপলিটন পুলিশ" প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সেই সাথে গ্রামাঞ্চল সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য তৈরি করেন "বাংলাদেশ আনসার" এবং "গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী" (ভিডিপি)। ৫৬ লক্ষ সদস্যের আনসার আজ বিশ্বের সর্ববৃহৎ নিরাপত্তা বাহিনী :O 

তিনি পুলিশ, আনসার ভিডিপি তে নারী সদস্য নিয়োগ শুরু করেন।

➧ দূর্বল সামরিক শক্তির দেশের জনগনকে যুদ্ধ প্রশিক্ষন দিয়ে দক্ষ করে তোলার ব্যাবস্থা করেন জিয়া। তাঁর জীবদ্দশায় ফায়ার করতে শেখে চল্লিশ হাজার নর-নারী।

➧ তিনি সামরিক বাহিনীর মান বৃদ্ধির জন্য মীরপুরে ডিফেন্স স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

➧ যুদ্ধের পর হাতে থাকা অল্প পরিমান সমরাস্ত্র নিয়ে কোনো দেশের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অবতির্ন হবার ক্ষমতা ছিলোনা বাংলাদেশের (৭১ সালে পাকিদের জমা দেয়া হাজার হাজার অস্ত্র সব ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যায় ভারত)

জিয়াউর রহমান তখন বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য "অনিয়মিত যুদ্ধ বা unconventional warfare (1980)" নামক একটি কৌশল উদ্ভাবন করে। এটি ছিলো গেরিলা যুদ্ধেরই একটি সংগঠিত এবং কাঠামোগত রূপ।

➧ স্বাধীনতার পর "বাংলাদেশ এয়ারফোর্স" কতটা ক্ষুদ্র এবং দূর্বল অবস্থায় ছিলো তা সকলেই জানেন। কয়েকটি হেলিকপ্টার, পাকিদের ফেলে যাওয়া কয়েকটা স্যাবর জেট এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উপহার দেয়া ১২ টি মিগ-২১ ই ছিলো বিএএফ এর সম্বল। এমন অবস্থায় স্বাধীন দেশে তিনিই সর্বপ্রথম ফাইটার এয়ারক্রাফট ক্রয়ের চেষ্টা শুরু করেন। তাও সেটা চায়না বা রুশ এয়ারক্রাফট নয়, তিনি ইতালির থেকে তাদের তৈরি থার্ড জেনারেশন "Fiat G.91"বম্বার-ফাইটার এবং আমেরিকার তৈরি "F-104 স্টারফাইটার" ক্রয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলাদেশ তখন সোভিয়েত ব্লকের দেশ থাকায় আমেরিকা ইতালিকে বিমানগুলো বিক্রির অনুমতি দেয়নি। ফলে মার্কিন ফাইটার ক্রয়ের প্রচেস্টাটি ব্যার্থ হয়। এর কিছুদিন পরেই তিনি মারা যাওয়ায় বাংলাদেশের ফাইটার কেনা বহু বছর পিছিয়ে যায়।

➧ সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় মার্কিন নৌবহর থামিয়ে যুদ্ধে জয়লাভের কারনে প্রথম থেকেই বাংলাদেশ মার্কিন রোশানলের কবলে ছিলো। বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক আমেরিকার সাথে শত্রুতা করে দূর্বল দেশটির উন্নয়ন ঘটানো অত্যন্ত কঠিন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।(ভেনুজুয়েলা, উত্তর কোরিয়ার অবস্থা দেখুন) জিয়াউর রহমান সেটা উপলব্ধি করে আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রচেস্টা শুরু করেন।

১৯৮০ সালের ২৭শে অাগষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফররত জিয়াউর রহমানকে উদ্দেশ্য করে দেয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন: 
PRESIDENT CARTER. It's a great pleasure for me this afternoon to welcome to the White House and to our Nation, President Ziaur, the very fine leader of Bangladesh. Since their war of independence in 1971, tremendous progress has been made under his leadership. And with the courage and determination of the people of his great country, with a population of about 90 million, and with tremendous opportunities for economic improvement, President Ziaur has been in the forefront of making the lives of the Bangladesh citizens better each year.

➧ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ইসলামি দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে জিয়াউর রহমান সফর করেন সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ইরান, পাকিস্তান, মালি, সেনেগাল, সিরিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ। মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় জিয়াউর রহমান বলিষ্ঠ ও স্বাধীনচেতা ভূমিকা রাখেন।

➧ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্টার ব্যক্তিগত চাপ প্রয়োগ করেও ইরানের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সমর্থন আদায় করতে পারেননি। ইরান-ইরাকের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধে জিয়া বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের আপত্তির কারণেই ১৯৭৯ সালে জাতিসঙ্ঘ ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেনি।

➧ ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনের সাময়িক সমাধান করা হয়। সমাধানের ফর্মুলা এমনই সুস্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে ভারতের পক্ষে সেখান থেকে সরে যাওয়ার পথ আদৌ ছিল না এবং এ বিষয়ে কোনো পক্ষ থেকেই আর কোনো আপত্তি করা হয়নি। এছাড়া তিনি বার্মার সঙ্গে সীমান্তরেখা নির্ধারণ করেন ও শরণার্থী সমস্যা আলোচনার উদ্যোগ নেন।

➧ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ফ্রান্সের সাথে পারমানবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, সেই সাথে পারমানবিক গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে পরমানু গবেষণার যাত্রা শুরু হয়।

➧ আরেকটা কথা না বললেই নয়, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আরব দেশ গুলো বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বকৃতীই দেয়নি। তিনিই সর্বপ্রথম সৌদি বাদশাহের সাথে বৈঠকের মাধমে বাংলাদেশের সাথে আরব বিশ্বের দূরত্বের অবসান ঘটান। এর ফলে ১৯৮১ সালে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) অন্যতম সহসভাপতি পদ লাভ করে বাংলাদেশ। ১৯৮০ সালে তিনি মক্কার ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে ভাষন প্রদান করেন।

গরিব মুসলিম দেশটির উন্নয়নে সৌদি বাদশা অর্থ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার পরিবর্তে আরব দেশ গুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের অনুরোধ করে। সেদিন তার দূরদর্শি সিদ্ধান্তের কারনে আজ বাংলাদেশ আরব বিশ্ব থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রেমিটেন্স আয় করছে........

আজ ১৯শে জানুয়ারি, জিয়াউর রহমানের জন্ম দিন.....

© অনির্বাণ

Post a Comment

0 Comments

close