সেরা ও শ্রেষ্ঠ আমলগুলো

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা
শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মাদ
সৃষ্টি ও পরিচালনার মতো শ্রেষ্ঠত্বদান ও নির্বাচনও একমাত্র আল্লাহর অধীনে। ‘আর আপনার প্রতিপালক তাই সৃষ্টি করেন যা তিনি ইচ্ছা করেন ও বাছাই করেন। তাদের বাছাই ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাদের শিরক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।’ (সূরা কাসাস : ৬৮)। আল্লাহর বাছাই ও নির্বাচনে তাঁর একত্ব, প্রভুত্ব, অসীম প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। ফেরেশতাকে সব সৃষ্টির মধ্যে বাছাই করে আলো দিয়ে তৈরি করেছেন। তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন। ‘তারা আল্লাহ যা আদেশ করেন তার অবাধ্যতা করে না, যা আদেশ করা হয় তা-ই পালন করে।’ (সূরা তাহরিম : ৬)।
তিনি আদম সন্তানকে মহিমান্বিত করেছেন। তাদের মধ্য থেকে নবী-রাসুল নির্বাচিত করেছেন। নবীদের মধ্যে মুহাম্মদ (সা.) কে বাছাই করে তাঁকে সবার নেতা বানিয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুলের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। তাঁর সাহাবায়ে কেরাম শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। তাদের মতো কেউ ছিল না, হবেও না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার প্রজন্ম সেরা মানুষ। তারপর পরবর্তীরা। তারপর তাদের পরবর্তীরা।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 
এ উম্মত ৭০টি উম্মতের সেরা উম্মত। জান্নাতের ১২০টি কাতারের মধ্যে তাদের কাতার হবে ৮০টি। ৪০টি অন্যদের। সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি সেই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী। রাসুলের পাশ দিয়ে দুইজন লোক গমন করল। একজন দরিদ্র। আরেকজন ছিল সম্ভ্রান্ত। প্রথমজনের ক্ষেত্রে তিনি বললেন, ‘এ লোকটি ওই লোকের মতো লোক দিয়ে ভরপুর পুরো পৃথিবীর চেয়ে উত্তম।’ (বোখারি)। জান্নাত মানুষের মর্যাদাপ্রাপ্তির জায়গা। আল্লাহ মোমিন বান্দাদের জন্য তা তৈরি করেছেন। জান্নাতুল ফেরদাউস সর্বোচ্চ জান্নাত। এর ওপরে আল্লাহর আরশ। জান্নাতবাসীর সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়া হবে আল্লাহর দর্শন লাভ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনি পর্দা সরিয়ে দেবেন। তাদের রবের দিকে তাকানো তাদের সবচেয়ে প্রিয় প্রতিদান হবে।’ (মুসলিম)।
মক্কা আল্লাহর জমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা। এখানে মুসলমানের কেবলা অবস্থিত। পৃথিবীর সর্বপ্রথম মসজিদ এখানে। এখানে নামাজ পড়া অন্য মসজিদে লাখ নামাজের চেয়ে উত্তম। মদিনা রাসুলের হিজরতভূমি। পবিত্র একটি নগরী। মসজিদে নববিতে নামাজ পড়া অন্য মসজিদে হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম। তিনটি মসজিদের দিকে সফরের আয়োজন করা হয়। ‘মসজিদে হারাম, মসজিদে আকসা ও নবীর মসজিদ।’ ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উত্তম জায়গা হলো মসজিদগুলো। আর নিকৃষ্ট হলো বাজারগুলো।’ (মুসলিম)।
জিকিরের মজলিশগুলো জান্নাতের বাগান। যে গৃহে কোরআন তেলাওয়াত হয়, কোরআনের আলোচনা হয় সেখানে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়। ফেরেশতা তাদের ঘিরে রাখে। সৎকর্মগুলো আল্লাহর কাছে বান্দার গচ্ছিত সঞ্চয়। তাদের সুখ, মুক্তি ও সফলতা এতেই নিহিত। এগুলোতেও আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্বের পার্থক্য করেছেন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে বান্দার জন্য ফরজ আদায় করাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায়। তাঁকে ভালোবাসতে নফল আমলগুলোও করতে থাকবে। সর্ববৃহৎ ফরজ খাঁটি ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, কোন আমলটি শ্রেষ্ঠ? তিনি বলেন, ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
নিষ্কলুষ অন্তর শ্রেষ্ঠ অন্তর। অন্তরের বিশুদ্ধতায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গও বিশুদ্ধ হয়। পরকালে আল্লাহর কাছে সুস্থ অন্তর না নিয়ে গেলে সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না। পূর্বসূরিরা তাদের ভেতরটা বিশুদ্ধ করেই এগিয়ে গেছেন। বকর আল মুজনি (রহ.) বলেছেন, আবু বকর (রা.) অধিক নামাজ-রোজা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেননি, বরং তার হৃদয়ে প্রোথিত একটি জিনিসের মাধ্যমে তা লাভ করেছেন।’ তার অন্তরে ছিল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও সৃষ্টির কল্যাণ কামনা। 
ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা সব কল্যাণ ও সফলতার মূল। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর দিকনির্দেশনা সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁর অনুসরণ আমলের সমৃদ্ধি ও গ্রহণযোগ্যতার উপায়। কালেমায়ে তৌহিদ হলো ইসলামের প্রতীক ও জান্নাতের চাবিকাঠি। এর মধ্যেই দ্বীনের সারাংশ, সূচনা ও পরিসমাপ্তি নিহিত। এটি ঈমানের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ শাখা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঈমানের শাখা সত্তরের উপরে। তার মধ্যে সর্বোচ্চটি হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাহু’ কালেমাটি।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পর্কচ্ছেদ করা দ্বীনের ও দ্বীনের অনুসারীদের জন্য দুর্গস্বরূপ। ঈমানের সুদৃঢ় বন্ধন হচ্ছে কাউকে আল্লাহর পথে ভালোবাসা ও আল্লাহর পথে অপছন্দ করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে ভালোবাসে ও ঘৃণা করে সে তার ঈমানকেই পরিপূর্ণ করল। এর মাধ্যমেই আল্লাহর নৈকট্য ও দ্বীনের স্বাদ পাওয়া যায়।
নামাজ বান্দা ও রবের মাঝে একটি বন্ধন স্থাপন করে। এটি সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র শারীরিক আমল। ইসলামের দ্বিতীয় ভিত্তি ও মজবুত খুঁটি। মোমিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া আবশ্যক। একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতে নামাজ পড়লে ২৭ গুণ সওয়াব বেশি হয়। সময়ের মধ্যে রমজান মাস, আরাফার দিন, শুক্রবার, রমজানের শেষ দশক এগুলো শ্রেষ্ঠ সময়। অন্যতম সৎকর্ম হলো দান-খয়রাত করা। রাসুলকে প্রশ্ন করা হলো, কোন ইসলাম শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, ‘খাবার খাওয়াবে, চেনা-অচেনা ব্যক্তিকে সালাম দেবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
রোজা জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢাল। দাউদ (আ.) এর মতো একদিন পরপর রোজা রাখা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছু নয়। কোরবানির দিন কোরবানি করা শ্রেষ্ঠ আমল। আল্লাহর রাস্তায় সকাল-বিকাল সময় দেয়া দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজ। আমলের আগে জ্ঞানার্জন করতে হবে। আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের প্রভূত জ্ঞান দান করেন। কোরআন তেলাওয়াত সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির। ‘সুবহানাল্লাহি, ওয়ালহামদুলিল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আল্লাহু আকবার’ এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কথা। আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়া নবী-রাসুলদের মহান দায়িত্ব। একজনকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসা ধনদৌলতের নেয়ামতের চেয়ে উৎকৃষ্ট। শিরক ও কুফরি থেকে বাঁচাতে তৌহিদের দাওয়াত দেয়া সর্বোচ্চ দাওয়াত। পূর্ণাঙ্গ মোমিন সেই ব্যক্তি, যে চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম। ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে দ্রুত ধাবিত হও।’

১ রজব ১৪৩৭ হি. মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর মাহমুদুল হাসান জুনাইদ

Post a Comment

0 Comments

close